আজ প্রথমবারের মত ইউএস-ইজরায়েল কোয়ালিশন ফোর্সের বিরুদ্ধে ইরান ১৫ ম্যাক গতির ফাত্তাহ-২ হাইপারসনিক মিসাইল ব্যবহার করেছে, যা ইন্টারসেপ্ট করা প্রায় অসম্ভব! এটি জর্ডান-ইরাকের ইউএস বেসগুলোকে টার্গেট করে লঞ্চ করা হয়েছে, এবং স্যাটেলাইট ইমেজে বিশাল ক্রেটার দেখা যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যের রণক্ষেত্রে আজকের এই ঘটনাটিকে সামরিক বিশ্লেষকরা বলছেন 'কাইনেটিক প্যারাডাইম শিফট'। কারন ১৫ ম্যাক (Mach 15) গতিতে ধেয়ে আসা এই মিসাইলকে ইন্টারসেপ্ট বা মাঝপথে ধ্বংস করা প্রায় অসম্ভব। জর্ডান ও ইরাকের মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলায় স্যাটেলাইট ইমেজে যে বিশাল বিশাল 'ক্রেটার' বা গর্ত দেখা যাচ্ছে, তা প্রমাণ করে আমেরিকার কয়েক বিলিয়ন ডলারের এয়ার ডিফেন্স সিস্টেমকে ফাত্তাহ-২ স্রেফ তুড়ি মেরে উড়িয়ে দিয়েছে।
সবচেয়ে চমকপ্রদ খবর হলো—লোহিত সাগর (Red Sea) থেকে মার্কিন ক্যারিয়ার গ্রুপগুলো নিরাপদ দূরত্বের দিকে পিছু হটছে।
কারণ?
হাইপারসনিক মিসাইলের 'লো-অল্টিটিউড ফ্লাইং' এবং ম্যানুভ্যাবিলিটি বা গতিপথ পরিবর্তনের ক্ষমতা। কোটি কোটি ডলারের যুদ্ধজাহাজগুলো এখন সাগরের বুকে স্রেফ 'সিটিং ডাক' বা সহজ লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে আছে। ড্রোনের পর এই হাইপারসনিকের এন্ট্রিই হলো যুদ্ধের আসল 'গেম-চেঞ্জার'।
ইরানের এই রণকৌশলটি অত্যন্ত নিষ্ঠুর অথচ বেশ কার্যকরী। তারা একযোগে ২৩০টিরও বেশি ড্রোন লঞ্চ করে বাহরাইন, সৌদি আরব ও কুয়েতের প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ব্যস্ত রেখেছে। সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান এয়ারবেসে ইরানের বিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন সামরিক আধিপত্যের এক চরম নড়বড়ে অবস্থাকে উন্মোচন করেছে।
এবার যুদ্ধের ইকোনমিক মডেলটি লক্ষ্য করুনঃ
ইরানি ড্রোনের খরচ মাত্র ২,০০০ ডলার (একটি আইফোনের দামের কাছাকাছি!)। আর একেকটা মার্কিন প্যাট্রিয়ট মিসাইলের খরচ প্রায় ২ মিলিয়ন ডলার!
ফলাফলঃ মাত্র এক মাসে আমেরিকার ইন্টারসেপ্টর মিসাইল রিজার্ভ ৪০% কমে গেছে।
প্রশ্ন হলো,
এই দীর্ঘমেয়াদী এবং ব্যয়বহুল যুদ্ধে ইরান কেন দমে যাচ্ছে না?
উত্তরটি সম্ভবত লুকিয়ে আছে বেইজিংয়ে।
চীন নিঃশব্দে ইরানকে প্রয়োজনীয় টেকনিক্যাল পার্টস এবং সাপ্লাই চেইন সচল রাখতে সাহায্য করছে। একদিকে পেন্টাগনের মজুত শেষ হচ্ছে, অন্যদিকে চীনের কারখানায় ড্রোনের প্রডাকশন লাইন তিন শিফটে চলছে।
সৌদি আরব এবং ইউএই (UAE) এখন আছে এক অদ্ভুত প্যারাডক্সের মধ্যে। দশকের পর দশক তারা মার্কিন ঘাঁটিগুলোকে নিরাপত্তার গ্যারান্টি মনে করত, কিন্তু আজ সেই ঘাঁটিগুলোই তাদের শহরগুলোর জন্য ড্রোনের ‘ম্যাগনেট’ বা টার্গেটে পরিণত হয়েছে। তারা এখন বেইজিংয়ের সাথে 'সিকিউরিটি গ্যারান্টি' নিয়ে টেবিলের নিচে দর কষাকষি শুরু করছে বলে অনুমেয়।
আবার চীনেরই কৌশলে এবার 'পেট্রোডলার' এর একক আধিপত্য ভাঙতে ত্বরান্বিত হচ্ছে 'পেট্রোয়ুয়ান ট্রানজিশন'। মানে ডলারের বদলে চীনা ইউয়ানে এবার তেল কেনাবেচা মুমকিন হতে যাচ্ছে। তেলের বাজারে ডলারের বদলে ইউয়ানের প্রবেশ মানে আমেরিকার জন্য পারমাণবিক বোমার চেয়েও বড় অর্থনৈতিক আঘাত।
আরেকদিকে,
ইরানের প্রক্সি নেটওয়ার্ক এখন কেবল সাপোর্ট নয়, তারা যুদ্ধের গতিপথ নির্ধারণ করছে। ইয়েমেনের হুথিরা লোহিত সাগরে (Red Sea) গ্লোবাল শিপিং প্রায় ৫০% স্থবির করে দিয়েছে। এটি আর কেবল আঞ্চলিক ইস্যু নয়, এটি বিশ্ব অর্থনীতির শ্বাসরোধ করার নামান্তর।
লেবাননের হিজবুল্লাহ ইসরায়েলের গভীরে থাকা হাই-ভ্যালু এয়ারবেসগুলোতে নিখুঁত স্ট্রাইক করে তারা ইসরায়েলি এয়ার ডিফেন্সের সীমাবদ্ধতা ফাঁস করে দিচ্ছে।
সিরিয়ার কুর্দ-তুর্কি ক্ল্যাশ নতুন করে রিজিওনাল অস্থিরতাকে উসকে দিচ্ছে।
তবে,
অনেকেই একটা জিনিস হয়ত খেয়াল করছেন না যে, ইরানের ভেতরের 'ওয়াটার ক্রাইসিস' বা পানির অভাব। তীব্র খরা, ভূগর্ভস্থ জলের অতিরিক্ত ব্যবহার এবং অদক্ষ ব্যবস্থাপনার কারণে ইরানে পানি সংকট চরমে পৌঁছেছে। পানির অভাবে সরকারের বিরুদ্ধে বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে; ২০২১ সালে এ কারনে ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে হতাহতের ঘটনাও ঘটেছিল। এই সংকট দেশটিতে অভ্যন্তরীণ অস্থিরতা বাড়াচ্ছে, যা ইরান সরকারকে বাইরে আরও বেশি এগ্রেসিভ বা আক্রমণাত্মক হতে বাধ্য করছে।
যাহোক,
৪০% স্টকপাইল লস নিয়েও আমেরিকা ও ইসরায়েল ইরানের লঞ্চারগুলো ধ্বংস করার চেষ্টা করছে ঠিকই, কিন্তু তারা এক বিশাল 'লজিস্টিক ট্র্যাপ' বা ফাঁদে আটকা পড়েছে।
এক মাসেই আমেরিকার ইন্টারসেপ্টর মিসাইল রিজার্ভ ৪০% কমে গেছে। তেলের দাম $৯০/ব্যারেল ছাড়িয়ে যাওয়ায় রাশিয়ার পকেট ভারী হচ্ছে, আর চীন নিঃশব্দে তাদের 'ইউয়ান আমব্রেলা' ছড়িয়ে দিচ্ছে। ট্রাম্প অ্যাডমিনিস্ট্রেশনের 'ফরএভার ওয়ার' বন্ধের প্রতিশ্রুতি এখন মধ্যপ্রাচ্যের এই চোরাবালিতে তলিয়ে যাচ্ছে।
এখন চূড়ান্ত প্রশ্ন হলঃ স্পেস ওয়ারফেয়ার কি অনিবার্য?
পরিস্থিতি যদি এভাবেই নিয়ন্ত্রণের বাইরে (Escalate) চলে যায়, তবে যুদ্ধের পরবর্তী গন্তব্য হবে স্পেস বা মহাকাশ। আমেরিকার স্যাটেলাইট-ব্যাকড নেভিগেশন বনাম ইরানের ড্রোন স্বার্ম এর এই দ্বৈরথ কি তবে মহাকাশের কক্ষপথ পর্যন্ত গড়াবে?
আমরা কি প্রস্তুত এমন এক পৃথিবীর জন্য যেখানে ডলারের কোনো মূল্য নেই, আর ইন্টারনেটের নিয়ন্ত্রণ নির্ভর করবে স্যাটেলাইট ধ্বংসের ওপর? জর্ডানের সেই ৩০০ মিলিয়ন ডলারের রাডার ধ্বংস হওয়া কেবল একটি শুরু ছিল, আসল 'চেকমেট' এখন আমাদের চোখের সামনে।
২০-৩০ বছর পর ইতিহাস যখন লেখা হবে, আজকের দিনটিকেই কি 'গ্রেট শিফট'-এর দিন বলা হবে?
আপনার কি মত?$ROBO
